স্বপ্ন ছুট

 হন্তদন্ত হয়ে বিপাশা ঢুকলো ডাক্তারের চেম্বারে। সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে এসেছে বিপাশা। জানতে এসেছে সে আদৌ মানসিক রোগে আক্রান্ত কিনা। একুশ বছর বয়স ওর। আশেপাশের অনেক লোক, কলেজের অনেক সহপাঠী বলে " তোর মাথার গন্ডগোল আছে" । এসব শুনে শুনে বিপাশা verify করতে এসেছে সত্যি কি তার মাথায় গন্ডগোল! বরং যারা এসব বলে বিপাশার মনে হয় তারাই প্রকৃত বিকৃত মস্তিষ্কের। সমস্যা হলো বিপাশা অন্যদের তালে তাল মিলিয়ে চলে না।অন্ধের মত সবকিছু মেনে নেয় না। সকলের মধ্যে থেকেও যেন তাদের মধ্যে থাকে না। ক্ষ্যাপাটে, ঠোঁটকাটা, কারো কিছু পছন্দ না হলে মুখের ওপর বলে দেয় সে যতই বড়বাবু হোক না কেনো। কোনও কাজ হাসিল করতে কাউকে তেল দিয়েও চলে না। 

মা বাবার একমাত্র মেয়ে বিপাশা। নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি তে বড় হলেও সে কোনো গোঁড়ামি র শিক্ষা পায়নি। আর পাঁচটা পরিবারের মেয়েদের যেসব সামাজিক বাধানিষেধ এর বেড়াজালে আটকে রাখা হয় ওর ক্ষেত্রে তা হয়নি। এমনকি ওর ঠাকুরদা ঠাকুমা ও ওকে শেখায়নি এটা করতে নেই, ওটা করতে নেই। সাধারণত পরিবারে ঠাকুমা থাকলে তিনি অনেকরকম আচরবিচারের পক্ষে থাকেন, কিন্তু বিপাশার ক্ষেত্রে তা হয়নি। ওকে কোনোদিন কেউ শিব রাত্রি র ব্রত পালন করতে ও শেখায়নি বা লক্ষী পুজোর পাঁচালী পড়তেও বলেনি। প্রথম যেদিন ঋতুস্রাব হলো সেদিন যদিও মা ঠাকুরমা এসে বলেছিলো এটা করিসনা, ওটা করিসনা, মন্দিরে যাস না কিন্তু তার প্রেক্ষিতে বিপাশার কেনোর জবাব দিতে গিয়ে ওনারা কয়েকবার ঢোক গিলে সে যাত্রায় আপাতত নিস্তার পেয়েছিল। তেরো বছরের ঋতুমতী বিপাশা প্রথম প্রথম কনফিউজ ছিল  ঋতুস্রাবের সঙ্গে মন্দিরে না যাওয়ার সম্বন্ধ নিয়ে। তারপর বিস্তার analysis এর পর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছিল যে সে মন্দিরে যাবে এবং যা যা করতে বারণ করা হলো সব সে করবে। কোথাও সে পড়েছিল " Unexperimental life meaningless". তাই জীবনের প্রথম এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলো দেবতার সঙ্গে। বিপাশার কাছে মেয়েদের ঋতুস্রাব একটা স্বাভাবিক সাইক্লিক পদ্ধতি, যা একটা বয়সের পর হয়, তার সঙ্গে অপবিত্রতার কি সম্পর্ক আর একটা মাটির তেরি দেবতা তাতে কেনো রুষ্ট হবেন এটাই বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে থেকেছিল ওর কাছে। যাইহোক কোনো দেবতা বিপাশার ওপর রুষ্ট হননি এই কাজের জন্য আপাতত। ওর যুক্তিবাদী মন ওকে আর পাঁচটা মেয়েদের থেকে আলাদা করেছিল। ওর বাবা বাসুদেববাবু ওকে সবকিছুতে খুব উৎসাহ দিয়েছেন। 

সেবার পাড়ার কয়েকজন বলেছিল - বাসুদেবাবু আপনার মেয়েকে একটু বুঝে সুঝে চলতে শেখান, এত ছেলেদের মাঝে আড্ডা মারে সেটা এই বয়স এ ঠিক নয়।

তাতে বাসুদেব বাবু উত্তর দিলেন - ওর যেখানে আনন্দ সেটাই তো ও করবে, আর আমার মেয়েকে নিয়ে আপনাদের এত না ভাবলেও চলবে।

Conservative ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগেনা বাসুদেব বাবুর,  মেয়েকে তাই এইসব ফালতু নিয়মের বাইরে রেখেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা বিপাশা কোনোভাবেই উশৃঙ্খল নয়, স্বাধীনতা কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা সে ভালই জানে। অন্যদের থেকে নিজেকে সে ভাগ্যবতী মনে করে এই কারণে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ওর বিচার বুদ্ধি আরো তীক্ষ্ম হয়েছে, মন আরো মুক্ত হয়েছে। আর সেখানেই এই গতানুগতিক সমাজের সঙ্গে ওর দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।

এহেন বিপাশা ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেই ডাক্তারকে বললো - আচ্ছা আপনার কি মনে হয় আমার মাথায় গন্ডগোল আছে? 

ডাক্তার একটু অপ্রস্তুত হলেন বটে তবে হেসে বললেন - কই না তো, তোমাকে তো  বুদ্ধিমতী মনে হচ্ছে। 

বিপাশা সঙ্গে সঙ্গে বললো - সে তো আমিও জানি আমি বুদ্ধিমতী, তবে কি জানেন আমাদের সমাজে মেয়েদের বেশি বুদ্ধি এটা সকলে মেনে নিতে পারে না।আমাকে তো চারিপাশের লোকজন পাগল বলে। তাই আপনার সঙ্গে consult করতে এলাম। 

ডাক্তার বললেন - ভালই করেছ, তুমি বসো, তোমার সঙ্গে কিছুক্ষন গল্পো করি। আচ্ছা তোমার মা বাবা তাঁরা কি বলেন তোমার সম্পর্কে।

বিপাশা বললো - কিছুই বলেন না, আমাকে খুব ভালোবাসেন, সবকিছুতে উৎসাহ দেন।

ডাক্তার বললেন - ব্যস  তাহলে আর চিন্তার কি। আসলে কি জানো বিপাশা আমাদের আসল শিক্ষা শুরু বাড়ি থেকে। সবাই তো যন্ত্রের মতো প্রিলোডেড মেকানিজমে চলছে। নিজস্ব কোনো নতুন চিন্তাভাবনা নেই। তাই তোমায় কে কি বলল সেসব না ভেবে নিজের মতে নিজের যুক্তিতে পথ চলো। শান্ত হয়ে এগিয়ে যাও।

বিপাশা বললো - আমি তো শান্ত নই, খুব রেগে যাই, চিৎকার করি, আসলে মানুষের ভন্ডামি, হিপোক্রেসি এসব আমায় যন্ত্রণা দেয়, আগুন জ্বলে ওঠে ভিতরে, সহ্য করতে পারিনা। 

ডাক্তার বললেন - সেইজন্য শান্ত থাকতে হবে, না হলে তোমারি ক্ষতি হবে। পুরনো অন্ধ বিশ্বাসকে ভেঙে ফেলে নতুন কিছুর প্রতিষ্ঠা দিতে মানুষ এখনও তেরি নয়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তো শুধু কিছু certificate দিচ্ছে, সেটা শুধুই কোয়ালিফিকেশন, এডুকেশন নয়, এডুকেশন এর জন্য ডিগ্রী দরকার হয়না। আসল শিক্ষা সেটাই যা  মানুষের মনের অন্ধকার দুর করে।সেটা হতে এখনো অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। তুমি তোমার চিন্তাভাবনায় অনেক এগিয়ে আছো, সেভাবেই এগিয়ে যাও।

কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল বিপাশা কিন্তু হটাত একটা ঝাঁকুনিতে ওর ঘুম ভেঙে গেলো, তাকিয়ে দেখলো মা কফির মগ নিয়ে ওকে ডাকছে। ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে দেখলো সে নিজের ঘরেই আছে, কোনো ডাক্তার এর চেম্বারে নয়। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্বেষণ

ধর্ম যখন প্রেম