ধর্ম যখন প্রেম
গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে আমি একটা দোকানে গেলাম কিছু মুখোরোচক খাবার আর জলের বোতল কিনবো বলে। দোকানে গিয়ে দেখলাম আমারই পরিচিত আমাদের গ্রামের একটি মেয়ে, শিউলী দি। আমরা একই স্কুল এ পড়তাম। শিউলী দি আমার থেকে বছর পাঁচকের সিনিয়র ছিল।বয়সের দিক থেকে আরো একটু বড়ই হবে, শুনেছিলাম একটা ক্লাস এ ফেল করেছিল দুবার, যদিও তারপর থেকে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করে পাশ করে। মাধ্যমিক এ সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাশ করেছিল। আমি যখন সিক্স এ পড়তাম তখন শিউলী দি পাশ করে স্কুল ছেড়েছিল। তারপর আর কোনোদিন দেখা হয় নি। আজ প্রায় বারো বছর পর দেখা তাও আবার এই খানে ! বললাম - আরে তুমি এখানে কেমন আছো? এটা কি তোমার দোকান?
শিউলী দি বললো - হ্যাঁ রে আমাদের দোকান, এই আমার হাজব্যান্ড হাবিবুল রহমান। তুই কেমন আছিস?
আমি এতক্ষন পাশে বসা যুবক কে লক্ষ্য করিনি। তাকিয়ে দেখলাম একটি মুসলিম যুবক কিছু জিনিসপত্র গোছগাছ করছে। ওর হাজব্যান্ড এর নামটা শুনে আমি একটু চমকে গেলাম কেননা যতদিন গ্রামে থাকতাম লোকমুখে শিউলিদির সম্পর্কে অন্য কথা শুনেছিলাম। আমার চমকানো মুখে হাসি ফুটিয়ে ওর হাজব্যান্ড এর সাথে পরিচয় বিনিময় করে শিউলী দি কে বললাম ভালো আছি গো।
আমার দরকারি জিনিসগুলো কিনে শিউলিদিকে ভালো থেকো বলে আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমি খুব একটা এই দিকে আসি না। অনেক বছর পর এক আত্মীয় এর বাড়িতে যাওয়ার জন্য এই পথে আসা। সেখানে পৌছতে এখনও প্রায় ২৫ কিমি। আরো একটা গাড়ি ধরতে হবে, সেখান থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে তারপর গন্তব্য এ পৌঁছাবো। গাড়িতে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে নানা আজগুপি ভাবনায় ডুবে যাওয়া আমার স্বভাব। তার ওপর এখন ভরা ভাদর। চারি দিকে সবুজের ছড়াছাড়ি। সবুজ আমার মনকে স্নিগ্ধ করে কিন্তু আজ আর সেটা হচ্ছে না। শিউলী দির ভাবনা আমায় অতীতে টেনে নিয়ে চলল।
অন্য পাড়ায় ওদের বাড়ি ছিল। মাধ্যমিক পাশের পর ইলেভেন এ পড়তে অন্য স্কুল এ আর্টস নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। বাড়ি থেকে সেই স্কুল অনেক দূরে ছিল। তখন গ্রামের দিকে ট্রান্সপোর্ট ছিল পায়ে হাঁটা বা যাদের অবস্থা ভালো তাদের সাইকেল। শিউলী দি প্রায় চার কিমি রাস্তা হেঁটে স্কুল এ যেত। সেই যাতায়াতের পথে একজনের সঙ্গে ওর প্রেম হয়েছিল। প্রথম এ চিঠি বিনিময় তারপর চলার পথে একটু কথা বলা তারপর একসাথে পথচলা। কতপথ যে ওরা একসঙ্গে হেঁটেছে! এইভাবে চলতে চলতে একদিন ওরা পালাল। শুনেছিলাম ওরা অন্য পাড়ায় গিয়ে ঘর বেঁধেছে। ছেলেটির বাড়ি থেকে ওদের বিবাহ মেনে নেয়নি।
ভালোবেসে ঘর বাঁধলো সবকিছু ছেড়ে কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ওদেরঘর ছেড়ে ভালোবাসাটাই হারিয়ে গেলো।রোজ রোজ নিত্য নতুন অশান্তি। প্রথমে মুখোমুখি, তারপর হাতাহাতি, লাঠালাঠি। একদিন প্রচন্ড মার খেয়ে ভালোবাসার বাসা ছেড়ে শিউলিদি আবার বাপের বাড়ি ফিরে এলো। স্বামী সংসার ছেড়ে চলে আসা মেয়েদের খুব একটা ভালো চোখে দেখে না সমাজ। এটাই যেনো রীতি যে যাইহোক না কেনো আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে স্বামী কে নিয়েই থাকতে হবে। নিজের বাবা মাও যেনো আত্বগ্লানিতে ভুগতে থাকতে যদি মেয়ে স্বামী সংসার ছেড়ে বাপের বাড়িতে আসে। যদিও শিউলী দি সেদিক থেকে ভাগ্যবতী ছিল। খুব দারিদ্র্য পরিবারের হলেও শিউলি দির মা মেয়েকে ঘরে জায়গা দিল সসম্মানে। আসলে শিউলী দির মা সারাজীবন মাতাল নেশাগ্রস্ত স্বামীর ঘর করে বুঝেছে কি যন্ত্রণায় আজ তার মেয়ে সব ছেড়ে চলে এসেছে।শিউলী দির মা দুবোন আর এক ভাইকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বড় করে তুলেছিল। প্রথমে দুটো মেয়ে হওয়াতে কম গঞ্জনা সইতে হয়নি।দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বামী হলেও ছেলে চাই সংসারে।শেষমেশ ছেলে হওয়াতে তবু একটু স্বস্তি দিয়েছিল ওর মাকে। এখন আর শিউলী দির মা কাউকে তোয়াক্কা করে চলে না। তাই শিউলী দির মা মেয়ের আবার বিয়ে দিতে পাত্রের সন্ধান এ লেগে পড়লো। কিন্তু ঘর ভাঙ্গা মেয়ের বিয়ে দেওয়া এত সহজ নাকি! কোনো অবিবাহিত যুবক বিয়ে করতেই চাইলো না। শিউলী দি এমনিতে দেখতে মানানসই ছিল। গায়ের রং ফর্সা র দিকে, বড় বড় মায়াবী চোখ। হাঁটতো দুলে দুলে ছন্দে ছন্দে।চেহারায় বেশ ডগমগ ভাব ছিল যাকে বলে টলোমলো যৌবন। সেই যৌবন সরসীতে অনেকে শুধু একটু ভিজতে চেয়েছিল কিন্তু যৌবনের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে একেবারে মরতে কোনো পতঙ্গ আসেনি। এমনি করে দুবছর কেটে গেলেও সৎ পাত্র পাওয়া যায়নি, এদিকে হটাত একদিন শিউলী দির মা হাঁপানি রোগে মারা গেলো। সংসারে র শেষ অবলম্বন টুকু ও রইলো না বেচারীর। শেষপর্যন্ত একদিন বাধ্য হয়ে পনেরো বছরের বড় পাড়ার একজনের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হয়ে শিউলী দি আবার স্বামী সংসার এ চললো। অগাধ সম্পত্তির মালিক, ভালোবাসা ছাড়া কোনোকিছুর অভাব ছিল না সেখানে। এখানে আর ভালোবাসার ঘর হলো না তবু ঘর ত হলো। বরের বড় আড়ৎ এর ব্যাবসা। নানা জায়গা থেকে লোকের যাতায়াত লেগেই থাকত ওদের বাড়িতে। সারাদিন তাদের ফাই ফরমাশ খাটতে খাটতে কখন যে দিন চলে যেত সে হুঁশ থাকত না।
হটাত ড্রাইভারের চিৎকারে আমার অতীতের তীর হতে নৌকা বর্তমানের তীরে ভিড়লো। দেখলাম লাস্ট স্টপেজ এসে গেছি। ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগ নামিয়ে হাঁটা শুরু করার আগে মাকে একটা কল করার জন্য ফোনটা ব্যাগ থেকে বার করলাম। পৌঁছে গেছি জানালাম। সেই সঙ্গে আমার কৌতুহল নিবারণের জন্য জিজ্ঞেস করলাম মা তোমার শিউলী দিকে মনে আছে? তোমার বাপের বাড়ির পাড়ায় বাড়ি ছিল।
মা বলল - মনে আছে বইকি, ও তো ওর বরের বাড়ি থেকে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়েছিল বিয়ের দুবছর পর। ওর বরের সঙ্গে ব্যাবসার জন্য একটি মুসলিম ছেলে এসেছিল, তার সঙ্গে প্রেম করেছিল। ওর বর সেটা জানতে পেরছিল। তারপর তো কি মারই না খেলো। তার কিছুদিন পর সেই ছেলেটা এসে ওকে নিয়ে পালিয়েছিল। তারপর আর কোনো খবর পায়নি। মা একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে বললো - হটাত তুই কেনো শিউলী র খবর জানতে চাইলি?
বললাম - এখানে আসতে গিয়ে একটা দোকানে দেখা হলো। ওর হাজব্যান্ড আর ও একসঙ্গে দোকান চালাচ্ছে। বেশ বড় দোকান। দুজনকে দেখে তো মনে হলো ওরা এখনও প্রেমে আছে।
মা শুনে বললো - যাক তাহলে শেষ পর্যন্ত মেয়েটা সংসার করলো।
মায়ের ফোনটা কেটে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। মায়ের শেষ কথাগুলো কানে বাজতে লাগলো মেয়েরা যেনো যেভাবেই হোক সংসার করবে এটাই রীতি। সেই সংসারে প্রেম ভালোবাসা থাক বা না থাক তাকে সেখানেই থেকে যেতে হবে। যাইহোক শিউলী দি যে ভালোবাসা ছাড়া শুধু সংসার করতে পারলো না তাই বার বড় ঘর ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস পেয়েছে। ক জন ই বা পারে সেটা! হয় জীবন্ত লাশ হয়ে স্বামী সংসার করো না হয় একদিন অকালে সত্যিকারের লাশ হয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ো! শিউলী দি শেষ অবধি মনের মানুষ পেয়েছে, সত্যিকারের প্রেম খুঁজে পেয়েছে তাই হিন্দু মুসলিমের ধর্ম নামক বিভদকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে সুখে ভেসে আছে।
মনে মনে শিউলী দিকে প্রণাম জানালাম। বললাম এমনি করে প্রেমে থেকো শিউলীদি ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন